এফবিসিসিআই আইআরসির সেমিনারে বিশেষজ্ঞদের মত

শক্তিশালী মেধাস্বত্ব আইন বাড়াবে উদ্ভাবন ও বিদেশী বিনিয়োগ

বাংলাদেশে উদ্ভাবনভিত্তিক অর্থনীতির ভিত্তি গড়ে তুলতে একটি শক্তিশালী, ভারসাম্যপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক মেধাস্বত্ব (আইপি) ব্যবস্থা অপরিহার্য বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশে উদ্ভাবনভিত্তিক অর্থনীতির ভিত্তি গড়ে তুলতে একটি শক্তিশালী, ভারসাম্যপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক মেধাস্বত্ব (আইপি) ব্যবস্থা অপরিহার্য বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, আইপি সুরক্ষা শুধু উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করে না, বরং তাকে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তর করে, যা বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও শিল্পায়নের গতিকে ত্বরান্বিত করে। গতকাল এফবিসিসিআইয়ের ইনোভেশন অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার (আইআরসি) আয়োজিত ‘স্ট্রেংদেন দ্য ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রেজিম ফর পোস্ট-এলডিসি কম্পিটিটিভনেস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেমিনারে এমন মত দেন বিশেষজ্ঞরা।

রাজধানীর টিকাটুলীতে অবস্থিত এফবিসিসিআইয়ের গবেষণা ও উদ্ভাবন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত ওই সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ওবায়দুর রহমান। সভাপতিত্ব করেন এফবিসিসিআই আইআরসির চেয়ারম্যান মো. জসিম উদ্দিন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশ্বব্যাংকের ট্রেড পলিসি উপদেষ্টা মো. হাফিজুর রহমান।

হাফিজুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ট্রিপস চুক্তির আওতায় কঠোর মেধাস্বত্ব আইন প্রয়োগের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। এখনো জনস্বার্থে ওষুধের পেটেন্ট না থাকলেও জেনেরিক উৎপাদন, বিদেশে বিক্রি হওয়া পণ্য কম দামে আমদানিসহ নয়টি সুবিধা কাজে লাগানো যাচ্ছে। তবে ২০৩৪ সালের পর এসব সুবিধা হারিয়ে যাবে। তবে সুদৃঢ় মেধাস্বত্ব শাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারলে উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতা জাতীয় অর্থনীতিতে কৌশলগত সম্পদে পরিণত হবে। এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বজায় রাখতে হলে বাংলাদেশকে জরুরি ভিত্তিতে তার আইপি শাসন ব্যবস্থাকে আধুনিক, কার্যকর ও ন্যায্যভাবে শক্তিশালী করতে হবে।’

আলোচনায় বলা হয়, এলডিসি সুবিধা হারালে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়বে দেশের ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্প। ওষুধের পেটেন্ট সুবিধা বাতিল হওয়ায় প্রযুক্তি ব্যবহারের খরচ বাড়বে, জেনেরিক ওষুধ উৎপাদন কঠিন হবে এবং জীবন রক্ষাকারী ওষুধের দাম বেড়ে যেতে পারে। সফটওয়্যার, হালকা প্রকৌশল এবং সৃজনশীল শিল্পসহ অন্যান্য খাতেও প্রযুক্তি ব্যবহারের খরচ বৃদ্ধি পাবে।

এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের মেধাস্বত্ব শাসনব্যবস্থা শক্তিশালী করতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেয়া জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। সেমিনারের তারা বলেন, ২০২৩ সালে প্রণীত নতুন পেটেন্ট, ডিজাইন ও কপিরাইট আইন এরই মধ্যে কার্যকর হয়েছে। এগুলোর বাস্তবায়ন ও প্রয়োগে প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। দেশে কার্যকর আইপি সংস্কৃতি গড়ে তুলতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্প খাত ও গণমাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া, ভর্তুকিযুক্ত ফাইলিং ফি এবং আইপিভিত্তিক অর্থায়ন ব্যবস্থা চালু করাও প্রয়োজন। এতে করে তারা উদ্ভাবনকে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তর করতে পারবে।

এছাড়া ট্রিপস চুক্তির আওতায় থাকা জরুরি ফ্লেক্সিবিলিটিগুলো—যেমন বাধ্যতামূলক লাইসেন্স, প্যারালাল ইমপোর্ট ও বোলার অ্যাকসেপশন ইত্যাদি আইনে অন্তর্ভুক্ত করে জনস্বার্থে প্রযুক্তি ও ওষুধের সহজপ্রাপ্যতা নিশ্চিত করার ব্যাপারেও গুরুত্ব আরোপ করেন বক্তারা। এ পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন করতে পারলে বাংলাদেশ এলডিসি-উত্তর বাস্তবতায় উদ্ভাবন, শিল্পায়ন ও জনস্বার্থ রক্ষায় কার্যকরভাবে এগিয়ে যেতে পারবে বলে মনে করেন তারা।

সেমিনারে আলোচকরা বলেন, আধুনিক আইন থাকা সত্ত্বেও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, সীমিত জনবল ও দুর্বল প্রয়োগ ব্যবস্থার কারণে নকল পণ্য ও পাইরেসি মোকাবেলা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য আন্তর্জাতিক আইপি নিয়ম মেনে চলার আনুষঙ্গিক খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা তাদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করছে।

আলোচনায় এফবিসিসিআই আইআরসির চেয়ারম্যান মো. জসিম উদ্দিন বলেন, ‘বাংলাদেশ এখনো লোকাল আইটেমকে আন্তর্জাতিকভাবে ব্র্যান্ড করতে পারেনি। গার্মেন্টসের সোর্সিংও ক্রেতাদের দেখিয়ে দেয়া পথে কাজ করছে। নিজেরা সোর্সিং করতে পারলে আরো বেশি লাভ হতো। অন্যান্য দেশের পণ্য ও সেবার সঙ্গে প্রক্রিয়াগুলোও প্যাটেন্টেড। এজন্য আমাদের আরো গবেষণা দরকার। নিজেদের শক্তিশালী করতে একাডেমিয়া, সরকার ও প্রাইভেট খাতকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।’

শিল্প সচিব মো. ওবায়দুর রহমান বলেন, ‘সারা পৃথিবীতেই একাডেমিয়া, সরকার ও বেসরকারি খাত একটি সমন্বিত হারমোনি সিস্টেমে কাজ করে। এক্ষেত্রে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। আমরা এককভাবে নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত, সমন্বিতভাবে কাজ করার উদ্যোগ নেই। বাস্তবতা হলো গ্র্যাজুয়েশন হবেই। এর বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের জন্য প্রয়োজনীয় সব ক্রাইটেরিয়া আমরা অনেক আগেই পূরণ করেছি। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে গবেষণা ও উন্নয়নের জায়গায় আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো লেখাপড়ার বাইরে গবেষণায় কতটা ব্যয় করছে, তা অজানা। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোয়ও গবেষণা নেই বললেই চলে। যেটুকু আছে, তা খুবই সীমিত ও অপ্রাসঙ্গিক। আমাদের অর্থনীতিতে ভ্যালু অ্যাড করবে এমন গবেষণা নেই। এলডিসি থেকে উত্তরণের পরের ধাক্কাটা এত কঠিন হবে, আমরা সেটা সামলানোর চিন্তাও করতে পারছি না।’

আরও